
ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর চলমান ফিফা বিশ্বকাপে বারবার আলোচনায় এসেছে। তবে ৭ জুলাই মিশর ও আর্জেন্টিনার শেষ ষোলোর ম্যাচের পর প্রযুক্তিটির প্রয়োগ এবং সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা নিয়ে বিতর্ক আরও বেড়েছে।
ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২:০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল মিশর। শেষ দিকে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা টানা তিনটি গোল করে ম্যাচের ফল পাল্টে দেয়। এর মধ্যে মিশরের একটি গোল বাতিল করা হয়। শেষ মুহূর্তে মোহামেদ সালাহর পেনাল্টির আবেদনও গ্রহণ করা হয়নি।
ম্যাচ শেষে মিশরের কোচ হোসাম হাসান অভিযোগ করেন, ফিফা হয়তো বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে টুর্নামেন্টে রাখতে চেয়েছে। তার মতে, মেসিকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখার ইচ্ছাও সিদ্ধান্তগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
মিশর ও আর্জেন্টিনা ম্যাচে কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক হয়েছে
মিশরের সবচেয়ে বড় আপত্তি ছিল মোস্তাফা জিকোর একটি গোল বাতিল করা নিয়ে।
ভিডিও পর্যালোচনায় দেখা যায়, গোলের আক্রমণ শুরু হওয়ার আগে মিশরের মিডফিল্ডার মারওয়ান আতিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ের ওপর পা রেখেছিলেন। ভিএআর ঘটনাটি রেফারির নজরে আনে এবং শেষ পর্যন্ত গোলটি বাতিল হয়।
মিশরের দাবি, কিছু সময় পর আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বক্সে সালাহ প্রায় একই ধরনের সংস্পর্শের শিকার হন। কিন্তু মাঠের রেফারি পেনাল্টি দেননি এবং ভিএআরও তাকে মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি দেখতে বলেনি।
এরপর পাল্টা আক্রমণ থেকে আর্জেন্টিনা জয়সূচক গোল করে। মিশরের অভিযোগ, কাছাকাছি ধরনের দুটি ঘটনায় ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছে।
এই কারণেই শুধু একটি সিদ্ধান্ত নয়, ভিএআরের নিরপেক্ষতা এবং ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ভিএআর আসলে কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে
ফুটবলে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি প্রযুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৮ সালে বিশ্বকাপে ব্যবহার শুরু করে ফিফা।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছিলেন, এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য মাঠের রেফারিদের আরও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করা।
মাঠের বাইরে একটি বিশেষ কক্ষে থাকা ভিডিও কর্মকর্তারা বিভিন্ন ক্যামেরা থেকে পাওয়া ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করেন। রেফারি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা দেখতে না পেলে অথবা স্পষ্ট ভুল সিদ্ধান্ত দিলে তারা ঘটনাটি পরীক্ষা করেন।
ভিডিও কর্মকর্তারা মনে করলে মাঠের রেফারিকে সাইডলাইন মনিটরে গিয়ে ফুটেজ দেখতে বলা হয়। তবে ভিএআর সরাসরি সব সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে না।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মাঠের রেফারির কাছেই থাকে। তিনি আগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে পারেন অথবা ভিডিও দেখে তা পরিবর্তন করতে পারেন।
ফিফার তথ্য অনুসারে, বর্তমানে বিশ্বের ৩০০টির বেশি প্রতিযোগিতায় ভিএআর ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের ভিডিও অপারেশন কক্ষ স্থাপন করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে।
কোন কোন ঘটনায় ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারে
শুরুতে চার ধরনের ঘটনায় ভিএআর ব্যবহারের অনুমতি ছিল।
এগুলো হলো গোলের আগে কোনো অনিয়ম, সম্ভাব্য পেনাল্টি, সরাসরি লাল কার্ড এবং ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়া।
২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে আরও দুটি পরিস্থিতি এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
এখন কর্নার কিকের সিদ্ধান্তে স্পষ্ট ভুল হলে ভিএআর তা যাচাই করতে পারে। দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের মাধ্যমে কোনো খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে বড় ধরনের ভুল থাকলেও ভিডিও কর্মকর্তারা হস্তক্ষেপ করতে পারেন।
তবে বল পুরোপুরি গোললাইন অতিক্রম করেছে কি না, সেটি ভিএআর নির্ধারণ করে না।
এই কাজের জন্য আলাদা গোললাইন প্রযুক্তি রয়েছে। ম্যাচ বলের ভেতরে থাকা বিশেষ চিপ থেকে রেফারির স্মার্টওয়াচে সংকেত পাঠানো হয়। বল সম্পূর্ণভাবে গোললাইন পার হলেই রেফারি তাৎক্ষণিকভাবে বার্তা পান।
বিশ্বকাপে ভিএআর কতবার সিদ্ধান্ত বদলেছে
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে প্রথমবার ভিএআর ব্যবহার করা হয়। সেই প্রতিযোগিতার ৬৪ ম্যাচে প্রযুক্তিটি ২০টি ঘটনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছিল।
এর মধ্যে ১৭টি ক্ষেত্রে মাঠের রেফারি নিজের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার ফাইনালে। ভিডিও পর্যালোচনার পর রেফারি হ্যান্ডবলের সিদ্ধান্ত দেন এবং ফ্রান্স পেনাল্টি পায়।
সেই পেনাল্টি থেকে এগিয়ে যাওয়ার পর ফ্রান্স শেষ পর্যন্ত ৪:২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে বিশ্বকাপের শিরোপা অর্জন করে।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ভিএআর ২৭ বার হস্তক্ষেপ করেছিল। রেফারিদের সাইডলাইন মনিটরে পাঠানো বেশিরভাগ ঘটনায় আগের সিদ্ধান্ত বদলে যায়।
এতে স্পষ্ট হয়, রেফারিকে মনিটরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সম্ভাবনা সাধারণত অনেক বেশি থাকে।
২০২৬ বিশ্বকাপে ভিএআরের ব্যবহার কমেছে
চলমান বিশ্বকাপ শেষ না হওয়ায় এখনই পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে বিবিসি স্পোর্টের ভিএআর বিশ্লেষক ডেইল জনসনের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৯৬টি ম্যাচে রেফারিদের ২৩ বার সাইডলাইন মনিটরে গিয়ে ঘটনা পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে।
আগের দুটি বিশ্বকাপের তুলনায় ম্যাচপ্রতি ভিডিও পর্যালোচনার সংখ্যা এবার কম।
মাত্র একটি ঘটনায় মনিটরে ফুটেজ দেখার পরও রেফারি নিজের প্রথম সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেননি। অন্য সব ঘটনায় ভিডিও পর্যালোচনার পর নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জনসনের মতে, ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়ারলুইজি কলিনা রেফারিদের স্বাভাবিক শারীরিক সংস্পর্শকে খেলার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে বলেছেন।
এর উদ্দেশ্য অপ্রয়োজনীয় ফাউল কমানো এবং খেলার গতি ধরে রাখা।
এই নির্দেশনার প্রভাব ফাউলের পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত প্রতি ম্যাচে গড়ে ২২.৬টি ফাউল হয়েছে।
২০২২ সালের বিশ্বকাপে এই গড় ছিল ২৫টি। ২০১৮ সালের আসরে প্রতি ম্যাচে গড়ে ২৭টি ফাউল দেওয়া হয়েছিল।
একই ধরনের ঘটনায় ভিন্ন সিদ্ধান্তই বিতর্কের প্রধান কারণ
ডেইল জনসন মিশরের বাতিল হওয়া গোলের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তার মতে, টুর্নামেন্টের অন্য ম্যাচগুলোতে যেভাবে শারীরিক সংস্পর্শ বিচার করা হয়েছে, মারওয়ান আতিয়ার ঘটনাটি সেই মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মাঠের রেফারিরা যদি একই ধরনের চ্যালেঞ্জকে স্বাভাবিক খেলা হিসেবে চালিয়ে যেতে দেন, তাহলে ভিএআর পর্যালোচনার সময়ও একই নীতি অনুসরণ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
জনসনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এবারের বিশ্বকাপে ভিএআরের হস্তক্ষেপ আগের চেয়ে কম হলেও সিদ্ধান্তের ধরন আরও অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হচ্ছে।
ফলে কোন ঘটনায় ভিডিও কর্মকর্তা হস্তক্ষেপ করবেন এবং কোন ঘটনাকে মাঠের সিদ্ধান্ত হিসেবে রেখে দেবেন, তা আগে থেকে বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে সালাহর সম্ভাব্য পেনাল্টির ঘটনায় তিনি বড় কোনো ভুল দেখছেন না।
জনসনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সালাহ পেনাল্টি বক্সের মধ্যে থাকায় ঘটনাটি সম্ভাব্য পেনাল্টি হিসেবে পরীক্ষা করা হয়েছিল। এ ধরনের ঘটনায় মাঠের সিদ্ধান্ত বদলানোর জন্য স্পষ্ট এবং শক্ত প্রমাণ প্রয়োজন হয়।
ভিডিওতে সংস্পর্শ দেখা গেলেও সেটি পেনাল্টি দেওয়ার মতো যথেষ্ট ছিল কি না, সেই মানদণ্ড আরও কঠোর।
ভিএআর প্রযুক্তি ভুল কমানোর জন্য চালু করা হলেও এর কার্যকারিতা শুধু ক্যামেরা বা ফুটেজের ওপর নির্ভর করে না। একই নিয়ম কতটা ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেটিই এখন বিতর্কের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।