ভুল কৌশলে মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল নষ্ট করল আর্জেন্টিনা

বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালের উচ্ছ্বাসের বিপরীতে লিওনেল মেসির মুখে ছিল গভীর হতাশা। নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে থাকা আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা যখন তার নাম ধরে গান গাইছিলেন, তখন দীর্ঘ সময় নির্বাক দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন ৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি।

হয়তো মেসির মনে তখন একটি প্রশ্নই ঘুরছিল, বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কাছ থেকে এমন ভালোবাসা পাওয়ার সুযোগ কি আর কখনো আসবে?

টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্য নিয়ে ফাইনালে নামা আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিও ম্যাচ শেষে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। মেসির জন্য এটিই শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, এ বিষয়ে অধিনায়কের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।

এরপর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন স্কালোনি। ডিসেম্বর মাসে তার বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। শেষ পর্যন্ত সংবাদ সম্মেলন অসমাপ্ত রেখেই কক্ষ ত্যাগ করেন তিনি।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশ ফুটবলারের গতি ও পারফরম্যান্স কমে যায়। তবে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়রা নিজেদের ভূমিকা বদলে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন।

মেসি শুধু মানিয়েই নেননি, বরং নিজের বয়স এবং কমে যাওয়া গতিকে আড়াল করতে ম্যাচের ছন্দ ও বলের নিয়ন্ত্রণকে নিজের শক্তিতে পরিণত করেছেন।

১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনার হয়ে অভিষেকের পর থেকে তিনি অন্তত পাঁচবার নিজের খেলার ধরন বদলেছেন। বর্তমানে আর্জেন্টিনা ও ইন্টার মায়ামির হয়ে যে মেসিকে দেখা যায়, সেটি তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ধারাবাহিক রূপান্তরের ফল।

৩৯ বছর বয়সেও বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি নিজের পায়ের জাদু দিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছেন। তবে স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল শেষে তার স্মরণীয় বিশ্বকাপ অধ্যায়ের সমাপ্তি খুব কাছে চলে এসেছে বলেই মনে হচ্ছে।

সম্ভাব্য শেষ ম্যাচে নিজের স্বাভাবিক ফুটবল খেলার সুযোগই যেন পেলেন না মেসি। আর্জেন্টিনার ভুল কৌশল, মাত্রাতিরিক্ত আগ্রাসন এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে জড়ানোর প্রবণতা তাকে ম্যাচের বড় অংশে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিল।

আক্রমণাত্মক পরিকল্পনায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন মেসি

ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা ফুটবলের চেয়ে শারীরিক লড়াই এবং প্রতিপক্ষকে উত্তেজিত করার দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। এই পরিকল্পনা তাদের মূল অনুপ্রেরণা মেসিকে সহায়তা করার বদলে ম্যাচ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

স্পেনের জয়কে ফুটবলের জয় বলেও বিবেচনা করা যায়। কারণ তারা বলের দখল, পাস এবং আক্রমণ তৈরিতে মনোযোগী ছিল। অন্যদিকে আর্জেন্টিনাকে অনেক সময় মনে হয়েছে, তারা ফুটবল ছাড়া বাকি সবকিছু নিয়েই বেশি ব্যস্ত।

ম্যাচের শুরুর দিকে স্লোভেনিয়ার রেফারি স্লাভকো ভিনসিক বেশ কয়েকটি কঠিন ফাউলের ক্ষেত্রে নমনীয় আচরণ করেন। পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষেরা এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল।

দানি ওলমোর ওপর আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জের পরও কোনো কার্ড দেখানো হয়নি। রেফারি কেবল মৌখিকভাবে তাকে সতর্ক করে দেন।

এই সিদ্ধান্তের পর স্পেনের সমর্থকেরা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নাম ধরে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান দিতে শুরু করেন। টুর্নামেন্টজুড়ে ছড়িয়ে পড়া কিছু ষড়যন্ত্র তত্ত্বের দিকেই তাদের ইঙ্গিত ছিল।

সেসব অভিযোগে বলা হয়েছিল, কিছু ম্যাচে কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার পক্ষে গেছে এবং তাদের ফাইনালে ওঠার পথ সহজ হয়েছে। যদিও এমন দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি, ফাইনালের কিছু সিদ্ধান্ত সেই বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে আসে।

লিসান্দ্রো মার্তিনেস মিকেল ওয়ারজাবালকে ফাউল করার পর ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন। ততক্ষণে প্রায় ৪০ মিনিট খেলা হয়ে গিয়েছিল। স্টেডিয়ামে উপস্থিত অনেক দর্শকের কাছে এত দেরিতে প্রথম কার্ড দেখানো ছিল বিস্ময়কর।

সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা নিজেদের দক্ষতা, সংগঠন এবং আক্রমণভাগের শক্তি দেখিয়েছিল। কিন্তু ফাইনালে তারা সেই সামর্থ্যকে কাজে লাগানোর বদলে এমন এক কৌশল বেছে নেয়, যা পুরো ম্যাচের গতি নষ্ট করে দেয়।

এই ধরনের ফুটবল মেসির প্রতিভা প্রকাশের জন্য কোনোভাবেই উপযোগী ছিল না। তিনি বল পেলে চারপাশে পর্যাপ্ত সতীর্থ পাচ্ছিলেন না। আর্জেন্টিনার আক্রমণগুলোও খুব দ্রুত ফাউল, বিতর্ক কিংবা বল হারানোর মাধ্যমে শেষ হয়ে যাচ্ছিল।

খেলোয়াড়দের আচরণে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়

ম্যাচের এক পর্যায়ে মেসিও উত্তেজনার মধ্যে জড়িয়ে পড়েন। স্পেনের মার্ক কুকুরেয়া মুখের সামনে হাত রেখে কথা বলার সময় মেসি রেফারির কাছে তাকে মাঠ থেকে বের করে দেওয়ার ইঙ্গিত করেন।

এই বিশ্বকাপে আক্রমণাত্মকভাবে মুখ ঢেকে কিছু বলাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে। তবে ওই ঘটনার পর কুকুরেয়ার বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এর আগে আর্জেন্টিনার আচরণের সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ দেখা যায় নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে। অতিরিক্ত সময় শুরু হওয়ার আগে এনজো ফার্নান্দেজ কোনো কারণ ছাড়াই পাউ কুবারসির ওপর চড়াও হন।

চেলসি মিডফিল্ডার বলের দিকে না তাকিয়েই স্পেনের ডিফেন্ডারকে মাটিতে ফেলে দেন। দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে তার মাঠ ছাড়াটা ছিল সম্পূর্ণ প্রত্যাশিত।

একজন খেলোয়াড় কমে যাওয়ার পর আর্জেন্টিনার কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। মেসির জন্য জায়গা তৈরি করা কিংবা তার সঙ্গে দ্রুত পাস বিনিময়ের সুযোগও কমে যায়।

দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নামা লেয়ান্দ্রো পারেদেসও পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে আরও উত্তেজিত করে তোলেন। এক পর্যায়ে তিনি এরিক গার্সিয়ার গলা চেপে ধরেন।

পরে স্পেনের গাভিকে মাটিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাতেও পারেদেস জড়িয়ে পড়েন। তার আচরণ আর্জেন্টিনার পুরো ম্যাচের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন ছিল।

খেলা শেষ হওয়ার পর আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা মেসিকে ঘিরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে আবেগঘন সেই দৃশ্য দ্রুতই দুই দলের খেলোয়াড় এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে অশোভন হাতাহাতিতে রূপ নেয়।

একটি অসাধারণ বিশ্বকাপের সমাপ্তি এমন ঘটনায় হওয়া উচিত ছিল না। প্রতিযোগিতাটি বহু স্মরণীয় ম্যাচ, অসাধারণ গোল এবং নতুন তারকার উত্থানের সাক্ষী হয়েছে। অথচ ফাইনালের পর আলোচনার বড় অংশ দখল করে নেয় সংঘর্ষ ও শৃঙ্খলাহীনতা।

নির্ধারিত সময়ে কোনো শট নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা

ফাইনালে আর্জেন্টিনার আক্রমণ কতটা দুর্বল ছিল, পরিসংখ্যানেই তার পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া যায়। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো শট নিতে ব্যর্থ হয়েছে তারা।

ম্যাচের ১১৭তম মিনিটে অবশেষে গোলের দিকে শট নেওয়ার সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা। সেই প্রচেষ্টাটি এসেছিল মেসির পা থেকে, কিন্তু বল লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

স্পেন পুরো ম্যাচে গোলমুখে ১২টি শট নেয়। বিপরীতে আর্জেন্টিনার অন টার্গেট শটের সংখ্যা ছিল শূন্য।

প্রথমার্ধের আরেকটি পরিসংখ্যান আর্জেন্টিনার পরিকল্পনার ব্যর্থতা আরও স্পষ্ট করে। প্রতিপক্ষের শেষ এক তৃতীয়াংশে তারা আটটি পাস সম্পন্ন করেছিল, অথচ ফাউল করেছিল নয়টি।

অর্থাৎ আক্রমণ তৈরির চেয়ে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের থামাতে এবং শারীরিক সংঘাতে জড়াতে বেশি সময় ব্যয় করেছে তারা।

মেসির মতো একজন সৃজনশীল খেলোয়াড়কে কার্যকর করতে হলে তার সামনে দৌড়ানো ফুটবলার, কাছাকাছি পাসের বিকল্প এবং বল দখলে স্থিরতা প্রয়োজন। ফাইনালে এসবের প্রায় কিছুই ছিল না।

তিনি মাঝমাঠে নেমে বল নেওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু স্পেনের সংগঠিত চাপের বিপক্ষে খুব কম সহায়তা পেয়েছেন। আর্জেন্টিনার সতীর্থরা নিজেরাই ম্যাচের ছন্দ নষ্ট করায় মেসির পক্ষে আক্রমণের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এই কারণেই মনে হয়েছে, সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচে মেসিকে প্রতিপক্ষের চেয়ে তার নিজের দলের পরিকল্পনাই বেশি হতাশ করেছে।

শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ হয়ে থাকতে পারে ফাইনালটি

স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচটি বিশ্বকাপে মেসির ৩৪তম উপস্থিতি। তার বয়স, ক্লাব ফুটবলের ব্যস্ততা এবং পরবর্তী আসরের দূরত্ব বিবেচনায় অনেকেই মনে করছেন, বিশ্বমঞ্চে এটিই হয়তো তার শেষ ম্যাচ।

মেসি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ার ঘোষণা দেননি। স্কালোনিও জানিয়েছেন, এই বিষয়ে তাদের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত আলোচনা হয়নি।

তবে ম্যাচ শেষে মেসির শরীরী ভাষা এবং গ্যালারির দিকে তার দীর্ঘ দৃষ্টি বিদায়ের ইঙ্গিতের মতোই মনে হয়েছে।

বিশ্বকাপে তার যাত্রা ছিল দীর্ঘ এবং ঘটনাবহুল। ব্যর্থতা, সমালোচনা, ফাইনালে হার এবং জাতীয় দল থেকে সাময়িক অবসরের পর তিনি শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছেন।

তাই তার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার শুধু ট্রফি দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। এটি এমন এক ফুটবলারের গল্প, যিনি দীর্ঘ সময় দেশের প্রত্যাশার ভার বহন করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সাফল্য এনে দিয়েছেন।

স্পেনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচটি তার প্রতিভার যথাযথ সমাপ্তি হতে পারেনি। আর্জেন্টিনার কৌশল এবং খেলোয়াড়দের আচরণ মেসিকে নিজের স্বাভাবিক প্রভাব দেখানোর সুযোগ দেয়নি।

তারপরও ফুটবল ইতিহাসে মেসির অবস্থান নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি এই খেলায় পা রাখা সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন এবং বিশ্বকাপে তার রেখে যাওয়া স্মৃতি বহু বছর ধরে আলোচিত হবে।

লেখক সম্পর্কে

১৯৮৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন রাজেশ কুমার, সাধারণ খেলার ক্ষেত্রে দশকেরও বেশি বিশেষজ্ঞতা সম্পন্ন অভিজ্ঞতা সহ এক পুরস্কৃত প্রাধিকর্তা। ২০০৮ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খেলার বিজ্ঞানে স্নাতক সমাপ্ত করার পর, কুমার ভারতবর্ষের বিভিন্ন খেলার একাডেমির সাথে সম্পর্কিত হয়েছেন, প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়াগুলির মাধ্যমে করে, তিনি তার অভ্যাসে বৈশ্বিক পদ্ধতিগুলি অবলম্ব করেছেন। রাজেশ বর্তমানে সাংবাদিকতায় নিযুক্ত, দৈনন্দিন খেলাধুলা নিয়ে নিবন্ধ লেখেন এবং Betting.BC.Game-এর প্রধান সম্পাদক।

আপনার মন্তব্য ছেড়ে দিন
সবাই আপনার মন্তব্য দেখতে পাবেন