এমবাপেদের ফ্রান্সকে আটকানোর পথ খুঁজছে বিশ্বকাপের বাকি দলগুলো

আগের বিশ্বকাপের রানার্স আপ এবং তার আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স এবার যেন আরও শক্তিশালী, আরও ধারালো এবং আরও আত্মবিশ্বাসী দল হয়ে উঠেছে।

নকআউট ম্যাচে ৩ গোলের ব্যবধানে জয় এমনিতেই বড় বার্তা। কিন্তু সুইডেনের বিপক্ষে যারা ম্যাচটি দেখেছেন, তারা জানেন স্কোরলাইন আসলে পুরো গল্প বলে না। সুইডেন আরও বড় ব্যবধানে হারতে পারত। ফ্রান্সের একের পর এক আক্রমণে তাদের রক্ষণ ভেঙে পড়ছিল বারবার। দুটি শট পোস্টে লাগে, একটি গোল অফসাইডে বাতিল হয়, আর সুইডেনের গোলকিপার ৯টি শট ঠেকিয়ে দলকে আরও বড় বিপদ থেকে বাঁচান।

তবে এই ম্যাচ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের খেলার ধরনটাই এমন। প্রতি ম্যাচে হয়তো এতটা আক্রমণাত্মক ঝড় ওঠে না, প্রতিপক্ষ গোলকিপারকে সব সময় এত কাজও করতে হয় না। কিন্তু প্রতিটি ম্যাচেই ফ্রান্সের কর্তৃত্ব বোঝা যাচ্ছে। তাদের গতি, পাসিং, ফিনিশিং এবং মাঠের নিয়ন্ত্রণ অন্যদের চেয়ে আলাদা মাত্রার মনে হচ্ছে।

এই দৌড়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পরিচিত মুখ কিলিয়ান এমবাপে। সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি এবারের বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ছয়ে নিয়ে গেছেন। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে তিনি এখন লিওনেল মেসির সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে।

শুধু গোলেই নয়, এমবাপে সৃষ্টিতেও বড় ভূমিকা রাখছেন। চলতি আসরে দুটি গোলে সহায়তাও করেছেন তিনি। ফলে তিনি শুধু ফিনিশার নন, ফ্রান্সের আক্রমণ নির্মাণেরও অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

সুইডেনের বিপক্ষে ফ্রান্স দেখাল নিজেদের আসল শক্তি

সুইডেনের বিপক্ষে জয়টি ফ্রান্সের জন্য আরেকটি ঐতিহাসিক ম্যাচও হয়ে থাকল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে তারা টানা পাঁচ ম্যাচে তিন বা তার বেশি গোল করল। এমন ধারাবাহিক আক্রমণাত্মক সফলতা খুব কম দলই দেখাতে পেরেছে।

এমবাপের পাশে উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, দেজিরে দুয়ে এবং ব্র্যাডলি বারকোলাদের উপস্থিতি ফ্রান্সকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। প্রতিপক্ষ যদি এমবাপেকে আটকাতে বেশি মনোযোগ দেয়, অন্য দিক থেকে দেম্বেলে বা ওলিসে জায়গা তৈরি করেন। কেউ যদি উইং বন্ধ করতে যায়, মাঝের ফাঁক কাজে লাগায় ফ্রান্সের অন্যরা।

এই আক্রমণভাগের বৈচিত্র্যই সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রতিপক্ষের জন্য। একজনকে থামালেই বিপদ কাটে না। দেম্বেলের গতি, ওলিসের পাসের চোখ, বারকোলার আগ্রাসী রান এবং এমবাপের ঠান্ডা মাথার ফিনিশিং মিলিয়ে ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড লাইন প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই বিপক্ষ রক্ষণকে অস্বস্তিতে ফেলছে।

মাঝমাঠ ও রক্ষণেও তাদের গভীরতা চোখে পড়ার মতো। শুধু তারকা নির্ভর দল নয়, ফ্রান্স এখন কাঠামোগতভাবেও খুব ভারসাম্যপূর্ণ। বল হারালে দ্রুত চাপ তৈরি করে, বল পেলে দ্রুত সামনে ওঠে এবং প্রয়োজন হলে ম্যাচের গতি কমিয়ে নিয়ন্ত্রণও নিতে পারে।

সব মিলিয়ে এই ফ্রান্স দলকে এবারের আসরে অন্যদের চেয়ে বেশি পরিণত মনে হচ্ছে। তারা শুধু শক্তিশালী নয়, তারা জানে কোন সময়ে কীভাবে ম্যাচ পরিচালনা করতে হয়।

এমবাপে শুধু গোল করছেন না, দলকেও টেনে নিচ্ছেন সামনে

ফ্রান্সের আক্রমণের সবচেয়ে বড় নাম অবশ্যই এমবাপে। কিন্তু সুইডেন ম্যাচে তিনি শুধু গোলদাতা হিসেবে নয়, নেতা হিসেবেও সামনে এলেন।

চমৎকার প্রথম গোলের পর তিনি কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে না গিয়ে সরাসরি ডাগআউটের দিকে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন কোচ দিদিয়ে দেশোঁকে। মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিয়ে ফ্রান্স থেকে ফেরার পর এটি ছিল দেশোঁর প্রথম ম্যাচ।

মুহূর্তটি ছিল আবেগে ভরা। ফ্রান্সের সর্বকালের সেরা গোলস্কোরার নিজের গোলটি যেন কোচকেই উৎসর্গ করলেন। এরপর দলে বাকিরাও যোগ দেন। সবাই মিলে দেশোঁকে ঘিরে উদযাপন করেন।

এটি শুধু একটি গোল উদযাপন ছিল না। এটি দেখিয়ে দিল এই ফ্রান্স দলের ভেতরের সম্পর্ক কতটা দৃঢ়। মাঠে তাদের বোঝাপড়া যেমন ভালো, মাঠের বাইরেও তারা একে অন্যের পাশে আছে। বড় টুর্নামেন্টে এই মানসিক সংযোগ অনেক সময় অতিরিক্ত শক্তি হয়ে ওঠে।

দেশোঁ ম্যাচের পর সেটিই বলেছেন। তার কথায়, দলটি ঐক্যবদ্ধ এবং তিনি না থাকলেও তারা দায়িত্ব নিয়ে খেলেছে। তিনি এটাও মনে করিয়ে দেন যে দলীয় চেতনা একা ম্যাচ জেতায় না, কিন্তু সেটি না থাকলে ম্যাচ হারার পথ তৈরি হতে পারে। তার কাছে সম্মিলিত শক্তিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মিডফিল্ডার অরেলিয়াঁ চুয়ামেনিও একই অনুভূতি প্রকাশ করেন। তিনি জানান, খেলোয়াড়রা জানেন কোচ কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাই তারা নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে তাকে খুশি করার চেষ্টা করছেন।

ফ্রান্সের ঐক্য প্রতিপক্ষের জন্য নতুন সতর্কবার্তা

ফুটবলীয় সামর্থ্য অনেক দলেরই থাকে। কিন্তু সেই সামর্থ্যের সঙ্গে যদি একতা, আত্মবিশ্বাস এবং পারস্পরিক আস্থা যুক্ত হয়, তখন দল আরও কঠিন হয়ে ওঠে। এবারের ফ্রান্সকে ঠিক তেমনই দেখাচ্ছে।

তাদের খেলা গোছানো, গতি প্রবল, ফিনিশিং নির্মম। কিন্তু এর বাইরে আরও একটি বিষয় চোখে পড়ছে। দলটি একসঙ্গে খেলছে। কেউ আলাদা করে নিজের জন্য নয়, পুরো কাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করছে। আক্রমণভাগ যেমন রক্ষণে সাহায্য করছে, মাঝমাঠ তেমন দ্রুত সংযোগ তৈরি করছে, আর রক্ষণ প্রয়োজনমতো সামনে উঠে চাপ ধরে রাখছে।

সুইডেন ম্যাচে ফ্রান্সের এই সম্মিলিত চরিত্র খুব পরিষ্কার ছিল। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারা প্রতিপক্ষকে সময় দেয়নি। সুইডেন কখনও ম্যাচে স্থায়ীভাবে ঢুকতে পারেনি। বল পেলেও চাপ, বল হারালেও চাপ, আর ফ্রান্স যখন গতিতে উঠেছে, তখন তাদের থামানো প্রায় অসম্ভব মনে হয়েছে।

ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার ইয়ান রাইটও ফ্রান্সের সামর্থ্য দেখে মুগ্ধ। তার মতে, এমন প্রতিভা ও শক্তিকে আটকানো খুব কঠিন। তিনি এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে সবচেয়ে পরিষ্কার ফেভারিটদের একটি হিসেবে দেখছেন।

১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপজয়ী পাত্রিক ভিয়েরাও একই সুরে কথা বলেছেন। তার মতে, ফ্রান্স সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে যে তাদের হারানো সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হতে যাচ্ছে।

এই মন্তব্যগুলো বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে না। কারণ ফ্রান্স এখন শুধু নামের ভারে নয়, মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।

সব হিসাবের পরও ফুটবলে অনিশ্চয়তা রয়ে যায়

ফ্রান্স যতই শক্তিশালী দেখাক, বিশ্বকাপ কখনও কেবল কাগজের হিসাব মেনে চলে না। একটি বাজে দিন, একটি লাল কার্ড, একটি ভুল পাস, একটি পেনাল্টি বা প্রতিপক্ষের অসাধারণ গোল যেকোনো ম্যাচ বদলে দিতে পারে।

তবু বর্তমান ফর্মের ভিত্তিতে ফ্রান্সের দুর্বলতা খুঁজে পাওয়া কঠিন। গ্রুপ পর্বে তাদের পারফরম্যান্স ছিল দাপুটে। নকআউটের প্রথম ম্যাচেও তারা সেই ছন্দ আরও উঁচুতে নিয়ে গেল। সুইডেনকে ৩ গোলে হারানো বড় বিষয়, কিন্তু আরও বড় বিষয় হলো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কতটা একতরফা ছিল।

এই ফ্রান্স দলকে দেখে মনে হচ্ছে তারা প্রতিটি ম্যাচে নতুন করে প্রতিপক্ষকে পরীক্ষা নিচ্ছে। কেউ তাদের গতি সামলাতে পারছে না, কেউ তাদের আক্রমণের গভীরতা আটকাতে পারছে না, কেউ আবার মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে পারছে না।

এমবাপে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দেম্বেলে, ওলিসে, বারকোলা ও অন্যরা আক্রমণকে নানা দিক থেকে শক্তিশালী করছেন। দেশোঁ কঠিন ব্যক্তিগত সময়ের মধ্যেও দলের মানসিক ভারসাম্য ধরে রেখেছেন। সব মিলিয়ে ফ্রান্সের এই সংস্করণকে থামানো কেবল ফুটবলীয় চ্যালেঞ্জ নয়, মানসিক পরীক্ষাও।

ধারাভাষ্যকার পিটার ড্রুরি সুইডেনের বিপক্ষে ফ্রান্সের তৃতীয় গোলের পর বলেছিলেন, এটি যেন স্বর্গীয় ফুটবল, পৃথিবীর কেউ কীভাবে থামাবে। বাক্যটি আবেগী শোনালেও বর্তমান ফ্রান্সকে দেখে প্রশ্নটি অস্বাভাবিক লাগে না।

এখন বাকি দলগুলোর সামনে একটাই কাজ। এই ফ্রান্সকে থামানোর উপায় খুঁজে বের করা। আপাতত সেই উত্তর কারও হাতে আছে বলে মনে হচ্ছে না।

লেখক সম্পর্কে

১৯৮৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন রাজেশ কুমার, সাধারণ খেলার ক্ষেত্রে দশকেরও বেশি বিশেষজ্ঞতা সম্পন্ন অভিজ্ঞতা সহ এক পুরস্কৃত প্রাধিকর্তা। ২০০৮ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খেলার বিজ্ঞানে স্নাতক সমাপ্ত করার পর, কুমার ভারতবর্ষের বিভিন্ন খেলার একাডেমির সাথে সম্পর্কিত হয়েছেন, প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়াগুলির মাধ্যমে করে, তিনি তার অভ্যাসে বৈশ্বিক পদ্ধতিগুলি অবলম্ব করেছেন। রাজেশ বর্তমানে সাংবাদিকতায় নিযুক্ত, দৈনন্দিন খেলাধুলা নিয়ে নিবন্ধ লেখেন এবং Betting.BC.Game-এর প্রধান সম্পাদক।

আপনার মন্তব্য ছেড়ে দিন
সবাই আপনার মন্তব্য দেখতে পাবেন