কাশ্মীরের সরু গলি পেরিয়ে ভারতের টেস্ট দলে আকিব নবী

শ্রীনগর থেকে বারামুলার দূরত্ব দীর্ঘ। তারও বাইরে শেরি গ্রামের সরু গলি ও সীমিত ক্রিকেট সুবিধার মধ্যে বেড়ে উঠেছেন আকিব নবী দার। পর্যাপ্ত মাঠ, অনুশীলনের উপকরণ কিংবা পেশাদার প্রশিক্ষণের সুযোগ খুব বেশি ছিল না। সেখান থেকেই উঠে এসে ২৯ বছর বয়সী এই পেসার প্রথমবার ভারতের সিনিয়র দলে ডাক পেলেন।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড জানিয়েছে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে বাঁ হাঁটুতে পাওয়া চোট থেকে পুরোপুরি সুস্থ হতে না পারায় যশপ্রীত বুমরা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজ খেলতে পারবেন না। তাঁর জায়গায় নির্বাচকেরা জম্মু ও কাশ্মীরের পেসার আকিব নবীকে দলে নিয়েছেন।

আকিবের বাবা একটি সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ছোটবেলায় তাঁর আগ্রহ বেশি ছিল ফুটবলে। পরে টেনিস বলের ক্রিকেট এবং দ্রুতগতিতে বল করার আনন্দ তাঁকে অন্য পথে নিয়ে যায়। উন্নত অনুশীলনের জন্য তাঁকে নিয়মিত বারামুলা থেকে শ্রীনগরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতো। কাশ্মীরের প্রতিকূল আবহাওয়া এবং সীমিত পরিকাঠামোও তাঁর অনুশীলনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

স্থানীয় ক্রিকেট থেকেই শুরু হয় পেসার হয়ে ওঠার পথ

স্থানীয় পর্যায়ে আকিবের ক্রিকেট শুরু হয়েছিল টেনিস বলে। প্রথমদিকে তিনি ব্যাটিং অলরাউন্ডার হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। বারামুলার বিভিন্ন প্রতিযোগিতা এবং ক্লাব ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে সংগঠিত ক্রিকেটের কাছাকাছি নিয়ে যায়।

অনুশীলন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভূমিকা বদলাতে থাকে। ব্যাটিংয়ের চেয়ে সুইং, সঠিক লাইন এবং দুই দিকে বল নড়ানোর দক্ষতাই ধীরে ধীরে তাঁর প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে। নিজের বোলিং উন্নত করতে আকিব বছরের পর বছর ধরে অ্যাকশন, রানআপ এবং বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করেছেন।

২০১৮ সালে বিজয় হাজারে ট্রফিতে জম্মু ও কাশ্মীরের হয়ে তাঁর লিস্ট এ অভিষেক হয়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে রঞ্জি ট্রফিতে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করেন তিনি। নিজের প্রথম মৌসুমেই ওড়িশার বিপক্ষে ৩৯ রানে পাঁচ উইকেট নিয়ে তিনি ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন।

তবে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসতে তাঁকে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। ২০২৪ থেকে ২৫ রঞ্জি মৌসুমে আকিব মাত্র ১৩.৯৩ গড়ে ৪৪ উইকেট নেন। সেই আসরে তিনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ছিলেন। এই সাফল্যই পরের মৌসুমের অসাধারণ অভিযানের ভিত্তি গড়ে দেয়।

রঞ্জির রেকর্ড গড়া মৌসুম বদলে দেয় ক্যারিয়ার

২০২৫ থেকে ২৬ মৌসুম আকিব নবীর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে। রঞ্জি ট্রফিতে তিনি ৬০ উইকেট নিয়ে আসরের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হন। তাঁর বোলিং গড় ছিল ১২.৬৫। পুরো মৌসুমের পারফরম্যান্সের জন্য তাঁকে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ও নির্বাচিত করা হয়।

গত দুই রঞ্জি মৌসুম মিলিয়ে তাঁর উইকেটসংখ্যা দাঁড়ায় ১০৪। জম্মু ও কাশ্মীরের কোনো বোলার এর আগে এক মৌসুমে ৫০ উইকেটের সীমা পার করতে পারেননি কিংবা রঞ্জির উইকেট তালিকার শীর্ষে থাকতে পারেননি। আকিব একই মৌসুমে দুটি কীর্তিই গড়েন।

বাংলার বিপক্ষে সেমিফাইনালে তাঁর বোলিংই ম্যাচের পার্থক্য তৈরি করে। প্রথম ইনিংসে ৮৭ রানে পাঁচ উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে আরও চারটি উইকেট পান তিনি। ব্যাট হাতে করেন গুরুত্বপূর্ণ ৪২ রান। তাঁর অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে ছয় উইকেটে জিতে প্রথমবার রঞ্জি ট্রফির ফাইনালে ওঠে জম্মু ও কাশ্মীর।

ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল কর্ণাটক। সেখানে ৫৪ রানে পাঁচ উইকেট নিয়ে আকিব আবারও দলের হয়ে বড় ভূমিকা রাখেন। ম্যাচটি ড্র হলেও প্রথম ইনিংসের বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় ইতিহাসে প্রথমবার রঞ্জি ট্রফি জেতে জম্মু ও কাশ্মীর। আকিব ৬০ উইকেট ও ২৪৫ রান নিয়ে মৌসুম শেষ করেন।

চার বলে চার উইকেটের পর খুলে যায় আইপিএলের দরজা

রঞ্জিতে সাফল্যের আগেই দুলীপ ট্রফিতে বিরল একটি কীর্তি গড়েছিলেন আকিব। ২০২৫ সালে উত্তরাঞ্চলের হয়ে পূর্বাঞ্চলের বিপক্ষে টানা চার বলে চার উইকেট নেন তিনি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ভারতীয় কোনো বোলারের জন্য এটি অত্যন্ত বিরল অর্জন। ওই স্পেলে পাঁচ উইকেটও পূর্ণ করেন আকিব।

এত ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পরও দীর্ঘ সময় আইপিএলে দল পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের নিলামে দিল্লি ক্যাপিটালস তাঁকে ৮ কোটি ৪০ লাখ রুপিতে দলে নেয়। ঘরোয়া ক্রিকেটে বছরের পর বছর অপেক্ষা করা এই পেসারের ক্যারিয়ারে সেটি ছিল আরেকটি বড় মোড়।

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আকিব এখন পর্যন্ত ৪৩ ম্যাচে ১৬২ উইকেট নিয়েছেন। তাঁর গড় ১৮.৬৩। এর মধ্যে ১৬ বার এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট এবং চারবার এক ম্যাচে দশ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে। নিচের দিকে ব্যাট করেও তিনি কার্যকর অবদান রাখতে পারেন।

ভারত এ দলের পারফরম্যান্সের পর এল কাঙ্ক্ষিত ডাক

সিনিয়র দলে নির্বাচিত হওয়ার আগে ভারত এ দলের হয়ে শ্রীলঙ্কা সফর করেন আকিব। দুটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে তিনি ছয় উইকেট নেন। প্রথম অনানুষ্ঠানিক টেস্টে শ্রীলঙ্কা এ দলের বিপক্ষে এক ইনিংসে চার উইকেট নিয়ে নির্বাচকদের নজর আরও বেশি কেড়ে নেন।

এরপর ৩ আগস্ট বুমরার বদলি হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করে বিসিসিআই। এটি আকিবের প্রথম সিনিয়র ভারতীয় দল ডাক। পারভেজ রসুল এবং উমরান মালিকের পর জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ভারতের সিনিয়র দলে সুযোগ পাওয়া তৃতীয় ক্রিকেটার তিনি। রসুল ও উমরান সীমিত ওভারের ক্রিকেট খেললেও এই অঞ্চলের কোনো ক্রিকেটার এখনো ভারতের হয়ে টেস্ট খেলেননি।

সুযোগ পেলে আকিব জম্মু ও কাশ্মীরের প্রথম টেস্ট ক্রিকেটার হতে পারেন। দীর্ঘ সময় ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটে সাফল্যের পর তাঁর সামনে এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের সুইং, নিয়ন্ত্রণ এবং ধৈর্যের পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ এসেছে।

গলে শুরু হবে আকিবের নতুন পরীক্ষা

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মূল সিরিজের আগে ভারতীয় দল কলম্বোতে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে। শুরুতে ম্যাচটি চার দিনের হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা তিন দিনে নামিয়ে আনা হয়েছে। ৭ থেকে ৯ আগস্ট কলম্বোর এনসিসি মাঠে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে।

দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ শুরু হবে ১৫ আগস্ট গলে। প্রথম টেস্ট চলবে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত। দ্বিতীয় ম্যাচটি ২৩ থেকে ২৭ আগস্ট কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব মাঠে অনুষ্ঠিত হবে। সিরিজটি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান চক্রের অংশ।

বারামুলার সরু পথ থেকে ভারতের টেস্ট ড্রেসিংরুম পর্যন্ত আকিবের যাত্রা সহজ ছিল না। দীর্ঘ অপেক্ষা, সীমিত সুযোগ এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে একের পর এক পরীক্ষার পর অবশেষে তাঁর সামনে জাতীয় দলের দরজা খুলেছে। এখন দেখার বিষয়, শ্রীলঙ্কার মাটিতে তিনি টেস্ট অভিষেকের সুযোগ পান কি না।

লেখক সম্পর্কে

১৯৮৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন রাজেশ কুমার, সাধারণ খেলার ক্ষেত্রে দশকেরও বেশি বিশেষজ্ঞতা সম্পন্ন অভিজ্ঞতা সহ এক পুরস্কৃত প্রাধিকর্তা। ২০০৮ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খেলার বিজ্ঞানে স্নাতক সমাপ্ত করার পর, কুমার ভারতবর্ষের বিভিন্ন খেলার একাডেমির সাথে সম্পর্কিত হয়েছেন, প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়াগুলির মাধ্যমে করে, তিনি তার অভ্যাসে বৈশ্বিক পদ্ধতিগুলি অবলম্ব করেছেন। রাজেশ বর্তমানে সাংবাদিকতায় নিযুক্ত, দৈনন্দিন খেলাধুলা নিয়ে নিবন্ধ লেখেন এবং Betting.BC.Game-এর প্রধান সম্পাদক।

আপনার মন্তব্য ছেড়ে দিন
সবাই আপনার মন্তব্য দেখতে পাবেন